দীর্ঘ ৪০ দিনের অবরুদ্ধ দশা শেষে মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত পবিত্র আল আকসা
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ ৪০ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে ফিলিস্তিনিদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল আকসা মসজিদ। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ভোরের আলো ফোটার আগেই অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে অবস্থিত এই মহিমান্বিত স্থাপনার ফটকগুলো দীর্ঘ অপেক্ষার পর পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়। ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথেই শত শত ধর্মপ্রাণ মুসল্লি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতে এবং ইবাদতে মগ্ন হতে দল বেঁধে হার্ট অব জেরুজালেমে প্রবেশ করেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি মেলায় এক আবেগঘন ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা উপস্থিত অনেকের চোখেই অশ্রু ঝরিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে দীর্ঘ বিরতির পর আল হারম আল শরিফের পবিত্র চত্বরে পা রেখেই অনেক মুসল্লিকে পরম মমতায় সিজদাবনত হতে দেখা গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার সূত্রপাত হওয়ার দিন থেকেই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আল আকসায় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল যা বিগত কয়েক দশকে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই দীর্ঘ সময়ে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা রাস্তায় কিংবা ছোট ছোট গলিতে নামাজ আদায় করতে বাধ্য হলেও এবার তারা পুনরায় তাদের প্রাণপ্রিয় মসজিদে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞার এই কালো সময়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর মানসিক ও ধর্মীয় চাপের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম তারা আল আকসায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আল আকসা যখন অবরুদ্ধ ছিল তখন গত ৬ এপ্রিল ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভীরের বিতর্কিত সফর স্থানীয় মুসলিমদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। একই সাথে খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থান চার্চ অব দ্য হোলি সেপুলকারও বন্ধ করে দিয়ে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষিতে এই বিধিনিষেধ শিথিল করাকে ফিলিস্তিনিদের এক বড় বিজয় ও আধ্যাত্মিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অস্ত্রের আস্ফালন আর রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন মানুষের ধর্মীয় অধিকারকে শৃঙ্খলিত করে তখন তা সভ্য সমাজের জন্য এক বড় কলঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। প্রার্থনা আর ইবাদতের পবিত্র ভূমি যখন মুক্ত হয় তখন তা কেবল একটি ইমারত খুলে দেওয়া নয় বরং কোটি মানুষের হৃদয়ের হাহাকার প্রশমিত হওয়ার নামান্তর। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তার পবিত্র স্থানে নির্ভয়ে ও বিনাবাধায় মস্তক অবনত করতে পারবে এবং জেরুজালেমের আকাশে কেবল শান্তির কপোত উড়বে। অন্ধকারের সকল দখলদারিত্ব আর বৈষম্য মুছে গিয়ে সহমর্মিতার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি পবিত্র ভূমি এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাক তার ইবাদতের নিরঙ্কুশ অধিকার ও নিরাপত্তা। সাহসের সাথে এই জয়কে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এক বৈষম্যহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে।