সেলফিবাজদের ভিড়ে বিঘ্নিত হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকতা সংবাদ সংগ্রহে চরম ভোগান্তি
সুয়েব রানা: সিলেট
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত সেলফিবাজদের ভিড়ে পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা উদ্বোধনী আয়োজনে প্রধান অতিথির সঙ্গে সেলফি তোলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচারের প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সংবাদকর্মীরা তথ্য, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহে গুরুতর বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
দেশের একাধিক অনুষ্ঠানে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান অতিথি মঞ্চে উঠতেই বা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের মুহূর্তে একদল দর্শনার্থী মোবাইল ফোন হাতে তাকে ঘিরে ধরছেন। এতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা নির্ধারিত স্থান থেকেও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছেন না। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধারণের সুযোগ হারিয়ে যাচ্ছে, যা সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ফটো সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কোণ থেকে ছবি তোলার সুযোগ না থাকায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফ্রেম পাওয়া যায় না। একজন জ্যেষ্ঠ ফটো সাংবাদিক বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবাদ পাঠানোর চাপ থাকলেও এখন প্রধান অতিথির সামনে অবস্থান নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। একই অভিযোগ টেলিভিশন সাংবাদিকদেরও। তারা জানান, লাইভ সম্প্রচারের সময় হঠাৎ কেউ সামনে মোবাইল তুলে ধরলে পুরো ফ্রেম নষ্ট হয়ে যায়, যা সম্প্রচারের মান ক্ষুণ্ণ করে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে ব্যক্তিগত প্রচার ও তাৎক্ষণিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অনেকে অনুষ্ঠানস্থলকে ব্যক্তিগত পরিচিতি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে এ প্রবণতা যদি পেশাদার সংবাদ সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা তথ্যপ্রবাহ ও গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার জন্য উদ্বেগজনক।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবও এ সমস্যাকে জটিল করছে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত মিডিয়া জোন থাকলেও তা কার্যকরভাবে সংরক্ষিত হয় না। নিরাপত্তাকর্মীরাও ভিড় নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে না পারায় পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানেও পেশাদার সংবাদ সংগ্রহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় আয়োজনে আলাদা মিডিয়া জোন নিশ্চিত করা, পরিচয়পত্র যাচাই জোরদার করা এবং নির্ধারিত সময় ছাড়া অতিথিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সীমিত রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এতে সাংবাদিকরা বাধাহীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এবং অনুষ্ঠানও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকবে।
সচেতন মহলের অভিমত, ব্যক্তিগত স্মৃতি ধারণের অধিকার সবার থাকলেও তা যেন অন্যের পেশাগত দায়িত্ব পালনে অন্তরায় না হয়। আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীদের দায়িত্বশীল আচরণই পারে এ বিশৃঙ্খলা রোধ করতে এবং সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে। পেশাদারিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সৌজন্যবোধের চর্চাই একটি সুস্থ গণমাধ্যম সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।