এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের অবসান ও ইরানের আগামীর চ্যালেঞ্জ
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তনের দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ২ মার্চ সোমবার। গত শনিবার সকালে যখন তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, তখন থেকেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ভাগ্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় জল্পনা। স্যাটেলাইট চিত্রে তাঁর বাসভবন ও সংলগ্ন কম্পাউন্ড মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ মিললেও ইরানি কর্মকর্তারা শুরুতে তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দাবি করেছিলেন। তবে দিনশেষে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্তার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিশ্চিত করে যে, দীর্ঘ ৩৬ বছর দেশ শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতার জীবনাবসান ঘটেছে।
ইরানের জন্য এই মুহূর্তটি নিয়তিনির্ধারক হলেও দেশটির নীতি-নির্ধারকেরা এমন পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই মানসিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। বিশেষ করে গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় থেকেই এই প্রস্তুতির গতি বাড়ানো হয়। ওই যুদ্ধে ইরানের একাধিক পরমাণু বিজ্ঞানী ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হওয়ার পর আয়াতুল্লাহ খামেনি নিজেই একটি বিশেষ বাঙ্কারে অবস্থান করে নেতৃত্বের সম্ভাব্য শূন্যতা পূরণের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। তিনি ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-কে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নিজের উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের একটি তালিকাও চূড়ান্ত করে রেখেছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ইতিপূর্বে জানানো হয়েছিল।
আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রয়াণে তাঁর অনুসারী এবং বিশেষ করে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর’ (আইআরজিসি)-এর জন্য এটি একটি বিশাল ধাক্কা। তবে বর্তমান নেতৃত্ব এখন বিশ্বকে দেখাতে চাইছে যে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এখনো তাঁদের হাতেই আছে এবং কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এই রূপান্তর সম্পন্ন হবে। খামেনির দীর্ঘ শাসনামল ছিল পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি গভীর সন্দেহ এবং ইসরায়েলের প্রতি চরম বৈরিতায় পূর্ণ। দেশের ভেতরেও তিনি সংস্কারের দাবি ও বিক্ষোভ কঠোর হস্তে দমন করেছেন। বিবিসির যাচাইকৃত কিছু ভিডিওতে তেহরানের রাস্তায় কিছু মানুষের উল্লাস দেখা গেলেও, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনের ক্ষত এখনো ইরানি সমাজের গভীরে রয়ে গেছে।
খামেনির আকস্মিক বিদায়ের পর এখন সবার নজর তাঁর উত্তরসূরির দিকে। তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির নাম দীর্ঘকাল আলোচনায় থাকলেও, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে কে চূড়ান্ত দায়িত্ব পান সেটিই দেখার বিষয়। তবে উত্তরসূরি হিসেবে যিনিই সামনে আসুন না কেন, বর্তমান শাসন ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হবে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা। ৪৭ বছরের পুরনো এই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পরিচালনায় কোনো গুণগত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে নানা প্রশ্ন থাকলেও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ইরানকে এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ক্ষমতার এই বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ইরান আজ এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। এক নেতার বিদায় অন্য নেতার আগমনের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আগামীর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের বিভীষিকা কাটিয়ে ইরান কি পারবে এক নতুন ভোরের সন্ধান পেতে? প্রতিহিংসা আর ধ্বংসের উর্ধ্বে উঠে মানবতার কল্যাণ ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে বিশ্বনেতারা কী ভূমিকা নেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। প্রতিটি অমূল্য জীবন যেন সুরক্ষিত থাকে এবং আগামীর পৃথিবী যেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয় এটিই আজ প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের অন্তিম প্রার্থনা।