সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতেও অটুট ইরানের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও আগামীর গতিপথ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ দেশটির জন্য এক বিশাল ধাক্কা হলেও এটি ইরানের স্বয়ংক্রিয় ও সুসংগঠিত শাসনব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি করবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত ৩৭ বছর ধরে ইরানের অপ্রতিরোধ্য শাসক হিসেবে খামেনি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতেও শাসনব্যবস্থা সমান কার্যকর থাকে। মূলত ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে শিয়া ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা শাসিত ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিশেষ আদর্শিক ব্যবস্থা রক্ষা করার লক্ষ্যেই গড়ে উঠেছে।
খামেনির উত্তরসূরি নিয়োগের জন্য ইরানে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী সাংবিধানিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নামক সংস্থাটি ভোটের মাধ্যমে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবেন। এই সংস্থার সদস্যরা বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি চরম অনুগত এবং ধারণা করা হচ্ছে যে খামেনির অনুসৃত নীতি ও আদর্শের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন—এমন কাউকেই তাঁরা পরবর্তী নেতা হিসেবে বেছে নেবেন। এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
তবে ইরানের সামগ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস বা আইআরজিসি। একটি বিশাল ও আদর্শিক সামরিক বাহিনী হিসেবে আইআরজিসির প্রধান উদ্দেশ্যই হলো ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যে কোনো হুমকি থেকে রক্ষা করা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান সরাসরি সামরিক সংঘাতে এই বাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। নতুন উত্তরসূরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইআরজিসি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রাখবে বলে নিশ্চিত, যাতে নতুন নেতা তাদের স্বার্থ ও ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি আপসহীন থাকেন।
নেতৃত্বের এই পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত এই ব্যবস্থাটি যে কোনো মূল্যে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। খামেনির প্রয়াণের পর ইরান যে এক নতুন ও চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে দেশটির মূল শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি এখনো অটল রয়েছে যা আগামীর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
এক নেতার বিদায় ইতিহাসের পাতায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করলেও কোনো জাতির পথচলা থেমে থাকে না। বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের হাহাকারের মাঝেও একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার মজবুত কাঠামোর ওপর। আমরা আশা করি ক্ষমতার এই রূপান্তর যেন সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন কোনো বিপর্যয় বয়ে না আনে এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রতিটি পক্ষ সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। অস্ত্রের আস্ফালন ছাপিয়ে মানুষের নিরাপত্তা আর মানবিকতা যেন জয়ী হয় এটিই আজ বিশ্ববাসীর চাওয়া। প্রতিটি জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।