মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহের ভিড় ও বায়ুমণ্ডলে উপজাত ধাতব কণার প্রভাবে ওজোন স্তরে নতুন সংকট
পৃথিবীর কক্ষপথে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক পরিবেশ ও মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। রবিবার (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে মহাকাশ প্রযুক্তি যেভাবে বিকশিত হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের রাতের আকাশের চিরচেনা রূপ বদলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে মহাকাশে প্রায় ১৪ হাজার সচল স্যাটেলাইট অবস্থান করছে এবং আরও প্রায় ১২ লাখের বেশি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিভিন্ন পর্যায়ে পাইপলাইনে রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক কৃত্রিম উপগ্রহ যখন তাদের কর্মক্ষমতা হারাবে তখন সেগুলোকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করিয়ে পুড়িয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে বায়ুমণ্ডলে স্যাটেলাইট ধ্বংসের এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা আকাশের চিতাঘর তৈরির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন কক্ষপথে থাকা এই উপগ্রহগুলো ধ্বংসের সময় বিপুল পরিমাণ অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতব কণা নির্গত হয় যা সূক্ষ্ম অ্যালুমিনা কণা হিসেবে বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে বহু বছর ভেসে থাকতে পারে। এই কণাগুলো সরাসরি ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধে মানবজাতির প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া মহাকাশে ক্রমবর্ধমান এই আবর্জনার স্তূপের কারণে ‘কেসলার সিনড্রোম’ বা এক উপগ্রহের সঙ্গে অন্যটির সংঘর্ষের ধারাবাহিক চক্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে যা ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণাকে সম্পূর্ণ অসম্ভব করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি ৩০ জানুয়ারি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স এর পক্ষ থেকে বিপুল সংখ্যক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের যে বিশাল আবেদন করা হয়েছে তা নিয়ে পরিবেশবাদীদের মাঝে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রযুক্তির এই অসম প্রতিযোগিতার ফলে যখন লক্ষ লক্ষ স্যাটেলাইট তাদের আয়ুষ্কাল শেষে আকাশে ভস্মীভূত হবে তখন বায়ুমণ্ডল ও ওজোন স্তরের ওপর যে অদৃশ্য চাপ তৈরি হবে তা মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা এখনও অর্জিত হয়নি। তাই মহাকাশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক টেকসই নীতি এবং কঠোর আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি হিসেবে দেখা দিয়েছে। কেবলমাত্র প্রযুক্তির জয়জয়কার নয় বরং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সচেতন থাকাই এখন আধুনিক বিজ্ঞানের বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মহাকাশের অসীম শূন্যতায় আমরা যখন আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রাখতে চাই তখন যেন ভুলে না যাই যে এই ধরণীই আমাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। পৃথিবীর নীল আকাশ আর শীতল বাতাস কেবল আমাদের সম্পদ নয় বরং এটি অনাগত প্রজন্মের উত্তরাধিকার। প্রযুক্তির আলো যেন কখনো প্রকৃতির অন্ধকার ডেকে না আনে সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। নক্ষত্রঘেরা রাতের আকাশ যেন কেবল কৃত্রিম ধাতব আবর্জনার স্তূপ না হয়ে ওঠে বরং তার চিরন্তন রহস্য নিয়ে মানবজাতির বিস্ময় হয়ে টিকে থাকে। প্রকৃতির সাথে প্রযুক্তির এক নিবিড় ভারসাম্যই পারে আমাদের সুন্দর ও নিরাপদ এক ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।