বৈশ্বিক সংঘাতের জেরে জ্বালানি সরবরাহে স্থবিরতা ও স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস ক্রয়ের সিদ্ধান্ত
মধ্যপ্রাচ্যের ইরান ও ইসরাইল কেন্দ্রিক ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশীয় চাহিদা মেটাতে সরকার এখন আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড চড়া দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে। রবিবার (৮ মার্চ) সংশ্লিষ্ট সরকারি ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে যে কাতার এনার্জি অনিবার্য পরিস্থিতি বা ফোর্স মেজার ঘোষণা করে সরবরাহ স্থগিত রাখায় দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে চারটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে চলতি মার্চ মাসের জন্য অস্বাভাবিক মূল্যে দুটি এলএনজি কার্গো আমদানির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে বছরের শুরুতে যেখানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১০ ডলারের আশেপাশে ছিল বর্তমানে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ২৮ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গানভোর নামক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ২৮ ডলার দরে একটি চালান কেনা হয়েছে যা আগামী ১৫ ও ১৬ মার্চের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া ভিটোল থেকে ২৩ দশমিক ০৮ ডলার দরে অপর একটি চালান কেনা হয়েছে যা ১৮ ও ১৯ মার্চের দিকে বন্দরে ভিড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমদানিকৃত এই গ্যাসের আকাশচুম্বী মূল্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করছে।
সরকার বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য অতি জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস বণ্টন করছে যার ফলে কৃষি ও শিল্প খাতে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কেবল সরবরাহ ব্যবস্থাকেই ভেঙে দেয়নি বরং বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক খোলা বাজারের এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প উৎসের সন্ধান করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এই সময়ে দেশের শিল্প ও কৃষির চাকা সচল রাখা এখন প্রশাসনের জন্য এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
অন্ধকার আকাশ যেমন ধ্রুবতারার অপেক্ষায় থাকে তেমনই সংকটের এই মুহূর্তে ধৈর্য আর সঠিক পরিকল্পনাই আমাদের একমাত্র পাথেয়। প্রতিকূল সমুদ্র পেরিয়ে আসা প্রতিটি পণ্যবাহী জাহাজ কেবল জ্বালানি নয় বরং কোটি মানুষের জীবনযাত্রার স্থিতি আর বেঁচে থাকার আশা নিয়ে আসে। যুদ্ধের আগুন যখন সুদূর সীমান্তে জ্বলে ওঠে তখন তার উত্তাপ আমাদের রান্নাঘর থেকে শুরু করে ফসলের মাঠ পর্যন্ত পৌঁছে যায় যা আমাদের একে অপরের প্রতি আরও সহমর্মী হতে শেখায়। আমরা প্রত্যাশা করি পারস্পরিক সমঝোতা আর শান্তির সুবাতাস একদিন এই মেঘাচ্ছন্ন সময়কে সরিয়ে দেবে এবং দেশের প্রতিটি ঘর ও কারখানা আবার পূর্ণ শক্তিতে আলোকিত হয়ে উঠবে। এভাবেই সাহসের সাথে বাধা অতিক্রম করে আমরা একটি সমৃদ্ধ ও নিরাপদ আগামীর পথে এগিয়ে যাব।