আকাশপথের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ফ্লাইটের মহাবিপর্যয়
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা এবং উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের আকাশপথে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় গত সাত দিনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সর্বমোট ২৪৫টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংকটের ধারা শুক্রবার (৬ মার্চ) পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র নিশ্চিত করেছে যে দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থায় কেবল শুক্রবারই ৩৩টি নির্ধারিত ফ্লাইট তাদের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে যা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
বেবিচক থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুদ্ধকালীন এই বিশেষ পরিস্থিতিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি এবং ১ মার্চ সর্বোচ্চ ৪০টি ফ্লাইট বাতিল হয়। সংকটের মাত্রা আরও ঘনীভূত হয় ২ মার্চ যখন ৪৬টি ফ্লাইটের যাত্রা স্থগিত করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত ছিল যেখানে ৩ মার্চ ৩৯টি, ৪ মার্চ ২৮টি এবং ৫ মার্চ ৩৬টি ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করা হয়। আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার সংযোগকারী রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বিমান সংস্থাগুলো যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
শুক্রবার বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর তালিকায় বিশ্বের বড় বড় সব বিমান সংস্থার নাম উঠে এসেছে। এদিন কুয়েত এয়ারওয়েজ ও জাজিরা এয়ারওয়েজের ৪টি করে এবং এয়ার অ্যারাবিয়ার শারজাহগামী ৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়। এছাড়া কাতার এয়ারওয়েজের ৪টি, ফ্লাই দুবাইয়ের ২টি, গালফ এয়ারের ২টি এবং এমিরেটস এয়ারলাইনসের ৪টি ফ্লাইট তাদের কার্যক্রম স্থগিত রাখে। দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ৫টি এবং জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেনি। বিপুল সংখ্যক এই ফ্লাইট বাতিলের ফলে হাজারো প্রবাসী শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রী বিমানবন্দরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যার প্রভাব সরাসরি দেশের রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অশান্ত পৃথিবীর এই রণহুঙ্কার যখন সুদূর আকাশসীমার চেনা পথগুলোকে রুদ্ধ করে দেয় তখন ঘরমুখো মানুষের অপেক্ষা দীর্ঘতর হয়। সীমানার সংঘাত কেবল দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে না বরং এটি প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন আর জীবিকার ওপর এক অদৃশ্য আঘাত হয়ে দেখা দেয়। বিমানবন্দরের রানওয়েতে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা এই উড়োজাহাজগুলো যেন আজ বিপন্ন শান্তির এক নিরব সাক্ষী হয়ে আছে। আমরা প্রত্যাশা করি যুদ্ধের দামামা থেমে গিয়ে পৃথিবীর আকাশ আবার উন্মুক্ত হবে এবং প্রতিটি যাত্রী নিরাপদে তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা ফিরে পাবে। আলাপ-আলোচনা আর সমঝোতার মাধ্যমে আকাশ থেকে অন্ধকারের মেঘ কেটে যাক এবং শান্তির আলোকবর্তিকা প্রতিটি জনপদকে আবার সংযুক্ত করুক এটাই এখন কোটি মানুষের একমাত্র আকুতি। এভাবেই আবার চঞ্চল হয়ে উঠুক আমাদের বিমানবন্দরগুলো আর ঘুচে যাক দূর পরবাসের অনিশ্চয়তা।