রক্তাক্ত ঈদযাত্রা: সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ দিনে ২৭৪ জনের প্রাণহানি
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ উদযাপনে বাড়ি ফেরার পথে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। উৎসবের আগে ও পরে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করেছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। শনিবার (২৮ মার্চ) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৩৪২টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদে প্রাণহানির এই পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা জাতীয় সড়ক ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটকেই বারবার সামনে নিয়ে আসছে।
এবারের ঈদযাত্রায় কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে যার ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গত ২১ মার্চ রাতে কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে ১২ জন যাত্রী প্রাণ হারান। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে তলিয়ে গেলে ২৬ জন আরোহীর করুণ মৃত্যু হয়। সরকারি সংস্থা বিআরটিএর দেওয়া তথ্যমতে ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মাত্র সাত দিনেই ৯২টি দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এক গবেষণা বলছে দেশের প্রায় ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হলো চালকদের বেপরোয়া গতি। এছাড়া মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য এই মরণফাঁদকে আরও জটিল করে তুলছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বর্তমান এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে কেবল উৎসবের সময় নয় বরং সারা বছর জুড়েই মহাসড়কে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে যাত্রীসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জোরালো পদক্ষেপ ও তদারকির দাবি জানানো হয়েছে যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।
উৎসবের রঙিন আলো যখন স্বজন হারানোর ব্যথায় বিবর্ণ হয়ে যায় তখন সেই শোকের ভার কোনো সান্ত্বনা দিয়েই মোচন করা সম্ভব নয়। একটি নিরাপদ সড়ক কেবল একটি যাতায়াত পথ নয় বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিটি যাত্রা হবে আনন্দময় এবং প্রতিটি যাত্রী নির্ভয়ে তার আপন নীড়ে ফিরে আসবে। অন্ধকারের সকল অব্যবস্থাপনা আর গতির নেশা মুছে গিয়ে সচেতনতার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি মহাসড়ক এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাক তার জীবনের অনাবিল নিরাপত্তা। সাহসের সাথে বিশৃঙ্খলাকে জয় করেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে এক নিরাপদ ও দুর্ঘটনমুক্ত আধুনিক বাংলাদেশ।