জগন্নাথপুরে পানির সংকটে বোরো জমি চৌচির বৃষ্টির জন্য হাহাকার
প্রকৃতির বৈরী আচরণ আর দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন কেবলই হাহাকার। বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কয়েক মাস ধরে বৃষ্টির দেখা না মেলায় ফসলি জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চারা রোপণের সময় সেচ দিয়ে কোনোমতে আবাদ শুরু করলেও বর্তমানে পানির তীব্র সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। মাঘ পেরিয়ে ফাল্গুনের তপ্ত রোদে মাঠের ফসল যখন শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন আকাশের পানে তাকিয়ে বৃষ্টির জন্য প্রহর গুনছেন হাওরপারের মানুষ।
বুধবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ফাল্গুনের এই দুপুরে নলুয়ার হাওর ও নারিকেলতলা হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির জন্য এক করুণ আর্তনাদ লক্ষ্য করা গেছে। কৃষকদের লোকগাঁথায় প্রচলিত ‘মাঘে মেঘে দেখা হবে’ সেই প্রাচীন বিশ্বাস এবার বাস্তবে রূপ নেয়নি। মাঘ মাস পেরিয়ে ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময় চললেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কোনো দেখা নেই। হাওরের বিল, ডোবা আর খাল নদীগুলো মাছ ধরার জন্য আগেই শুকিয়ে দেওয়ায় এখন একমাত্র প্রাকৃতিক বৃষ্টি ছাড়া সেচ দেওয়ার আর কোনো বিকল্প উৎস অবশিষ্ট নেই।
নলুয়ার হাওরের কৃষক এনামুল হক ও আনোয়ার হোসেনের মতো অনেকেই আক্ষেপ করে জানান, পানির অভাবে জমির মাটি আলগা হয়ে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং বৃষ্টির অভাবে ধানের চারা লালচে বর্ণ ধারণ করছে। কৃষকদের মতে, এই মুহূর্তে আকাশ থেকে ঝরা দু ফোঁটা পানি কেবল জমির তৃষ্ণা মেটাবে না, বরং তা ধানকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করে সোনালী ফলনের নিশ্চয়তা দেবে। জমির মালিকরা জানান, নদী নালা শুকিয়ে ফেলায় তারা এখন সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ছোট বড় ১২টি হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে এবার ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। যেখান থেকে সরকারিভাবে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী গত সপ্তাহে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তা হয়নি। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত বৃষ্টি হলে ফসলের এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এবং ফলন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত হবে।
মাটির বুক চিরে যখন ফসল জাগে, তখন কৃষকের মনে রঙিন স্বপ্নের জন্ম হয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন পানির অভাবে মাঠেই পুড়ে যায়, তখন তা গোটা জনপদের জন্য এক বিষাদময় অধ্যায়ের সৃষ্টি করে। প্রকৃতির এই আচরণ কাটিয়ে আবারও হাওরের বুক স্নিগ্ধ বৃষ্টির পরশে ভরে উঠুক এবং কৃষকের কঠোর পরিশ্রমের ফসল গোলায় উঠুক সুনামগঞ্জের আকাশজুড়ে এখন কেবল এই একটি প্রার্থনাই ধ্বনিত হচ্ছে।