সংগ্রাম ও সাফল্যের অদম্য শিখা: সিলেটে শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান
প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে সাফল্যের সুউচ্চ শিখরে আরোহণ করা অদম্য নারীদের জীবনযুদ্ধের স্বীকৃতি আর জয়গানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সিলেটের পুণ্যভূমি। সমাজ পরিবর্তনের অনন্য কারিগর এবং অবর্ণনীয় সংগ্রামকে জয় করা এই নারীদের অদম্য সাহসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে আজ বুধবার (৪ মার্চ) এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সিলেট নগরীর পূর্ব শাহী ঈদগাহ এলাকায় অবস্থিত জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বেলা ১১টায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কৃতি নারীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা উন নবী।
নারীশক্তির জাগরণ ও মেধার যথাযথ মূল্যায়নে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে মানবসভ্যতা ও ধর্মের ইতিহাসে নারীকে সর্বদাই সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের নারীরা তাদের প্রজ্ঞা ও অসামান্য দক্ষতা দিয়ে শিক্ষা, সমাজসেবা, উদ্যোক্তা ও সংস্কৃতির প্রতিটি আঙিনায় সাফল্যের উজ্জ্বল পদচিহ্ন রেখে চলেছেন। বিভাগীয় কমিশনার আরও জানান যে একজন নারীর এই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথচলায় পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইতিবাচক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এই নারীদের সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে যাতে তারা দেশের উন্নয়নে সমান্তরাল ভূমিকা রাখতে পারেন।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুপ্রেরণায় এবং সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আশিক উদ্দিন। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক শাহিনা আক্তারের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত নিপুণভাবে সঞ্চালনা করেন চাইল্ড রাইটস অফিসার প্রিয়াংকা দাস রায় এবং জেলা কালচার অফিসার জ্যোতি সিনহা।
এ বছর পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জন করেছেন পাঁচজন অদম্য নারী। অর্থনৈতিক সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো বিয়ানীবাজারের কলসুমা বেগম, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মৌলভীবাজারের মোছাম্মৎ আমিনা বেগম, মাতৃত্বের মহিমায় ভাস্বর হবিগঞ্জের মোছা. রহিমা বেগম, জীবনের কঠিন অন্ধকার জয় করে ফিরে আসা কাঞ্চন বেগম এবং সমাজ সংস্কারে নিবেদিতপ্রাণ সিলেটের রিফাত আরা রিফাকে এই বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা হয়। বিজয়ী এই জয়িতাদের প্রত্যেকের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্রের পাশাপাশি ২৫ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। এছাড়াও রানার্সআপ হিসেবে সায়রা বেগম, চিরশ্রী পৈত্য, গুলরাজ বেগম, আয়শা আক্তার মুক্তা এবং খাদিজা বেগমকে বিশেষ সম্মাননা ও ৫ হাজার টাকার অর্থ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় যখন সম্মাননাপ্রাপ্ত নারীরা তাদের জীবনসংগ্রামের লোমহর্ষক ও অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন। উপস্থিত বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে এই নারীদের লড়াইয়ের গল্প কেবল ব্যক্তিগত বিজয় নয় বরং তা আগামী প্রজন্মের হাজারো তরুণীর জন্য অন্ধকারের মাঝে এক প্রদীপ্ত আলোকবর্তিকা। আসলে জীবনের প্রতিটি বাঁকে যারা অবহেলা আর বঞ্চনাকে পায়ের নিচে মাড়িয়ে নতুন ভোরের সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন, তারাই আমাদের সমাজের প্রকৃত নায়ক। তাদের প্রতিটি ত্যাগের গল্প আজ সাফল্যের মুক্তোয় পরিণত হয়েছে যা দেখে দূর পরবাসে থাকা প্রতিটি প্রবাসী বাঙালি গর্ব অনুভব করবেন। এই মহীয়সী নারীরা প্রমাণ করেছেন যে ইচ্ছাশক্তি যদি হিমালয়ের মতো অটল হয় তবে পৃথিবীর কোনো বাধাই তাকে আটকে রাখতে পারে না। তাদের এই জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি নারীদের অদম্য শক্তিতে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলুক।সংগ্রাম