টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় অদূরদর্শী পরিবর্তনের খেসারত: সংকটে দেশের শিশু স্বাস্থ্য ও টিকাদান কর্মসূচি
দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকট ও উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত অদূরদর্শিতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান অস্থিরতা ও শিশুদের মাঝে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পূর্ববর্তী প্রশাসনের নেওয়া কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও নীতি নির্ধারকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে যে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চালু থাকা স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি বা সেক্টর প্রোগ্রামটি আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। ১৯৯৮ সাল থেকে দাতা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত এই কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশ অত্যন্ত সহজে ও দ্রুততম সময়ে টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। তবে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে আগের সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা অনুসরণ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কোনো প্রকার পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ২০২৫ সালের মার্চে এই সেক্টর প্রোগ্রামটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন যে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত না করেই এমন হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়ায় দেশের সামগ্রিক টিকাদান কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে যে ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে সরাসরি টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দর কষাকষি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে পুনরায় ইউনিসেফকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ততদিনে প্রায় ছয় মাস টিকা কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এই দীর্ঘ বিরতির ফলে ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে মাঠ পর্যায়ে টিকার মজুদ ফুরিয়ে যেতে শুরু করে এবং অভিভাবকরা কেন্দ্র থেকে বারবার ফিরে আসতে বাধ্য হন। আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনসহ অন্যান্য অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে পরিকল্পিত পরিবর্তনের অভাব ও অদূরদর্শী পদক্ষেপের কারণেই আজ ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও এইডসের মতো জরুরি স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোও হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হাম। ইতোমধ্যে কয়েকশ মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি তিন ডজনেরও বেশি শিশুর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদিও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তবে বর্তমান পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের জন্য এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ বেড়ে ওঠার ওপর। প্রশাসনিক ভুল বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে যখন একটি শিশুর জীবন বিপন্ন হয় তখন তার দায়ভার কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। নীতিমালার পরিবর্তন হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণের জন্য কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা আশা করি বর্তমান প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে টিকার এই শূন্যতা পূরণ করবে এবং প্রতিটি শিশুর হাসিমুখে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করবে। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য এবং তাদের রক্ষায় আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা অনস্বীকার্য।