ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক আলোচনা: বিশ্বশান্তির পথে এক নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসন ও একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বৈঠকে বসছে চিরবৈরী দুই রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনাকে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এক ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর এই প্রথম দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিরা সরাসরি সংলাপের টেবিলে বসছেন যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মোড় ঘুরাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যার সাথে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং তার সাথে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ দেশটির জ্যেষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা। মূল আলোচনা শুরুর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয় প্রতিনিধিদলের সাথে পৃথকভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন। এই বৈঠককে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং রেড জোনসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সাধারণের চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে উভয় দেশের প্রস্তাবিত পৃথক দুটি রূপরেখা যার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। ইরানের পক্ষ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে যার প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দকৃত সকল সম্পদ অবমুক্ত করা। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা প্রস্তাবের একটি কাঠামো নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সীমিত করা এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখার শর্তগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। যদিও আলোচনার শুরুতেই পাল্টাপাল্টি শর্ত ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় লক্ষ্য করা গেছে তবুও কূটনৈতিক মহলে একটি ফলপ্রসূ সমাধানের ব্যাপারে ক্ষীণ আশা জাগছে।
অস্ত্রের হুঙ্কার আর ধ্বংসলীলায় যখন সাধারণ মানুষের জীবন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপন্ন হয় তখন সংলাপই হয়ে ওঠে একমাত্র আশার আলো। দীর্ঘ অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে দুই পরাশক্তির মুখোমুখি বসা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয় বরং এটি লাখো মানুষের বাঁচার অধিকার পুনরুদ্ধারের এক সাহসী পদক্ষেপ। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধান মিলবে আলোচনার মাধ্যমে এবং বিশ্বের কোনো আকাশেই আর যুদ্ধের কালো মেঘ জমা হবে না। অন্ধকারের সকল প্রতিহিংসা আর অস্থিতিশীলতা মুছে গিয়ে শান্তির আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি সীমান্ত এবং প্রতিটি রাষ্ট্র ফিরে পাক তার পারস্পরিক মর্যাদা ও স্থিতিশীলতা। সাহসের সাথে এই শান্তির পথ অন্বেষণ করেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে এক যুদ্ধমুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব।