হিমালয়কন্যা নেপালে ওলি বনাম বালেন শাহ; তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার চরম লড়াই
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক উত্তাপ এখন হিমালয়বেষ্টিত নেপালকে ঘিরে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রবল দুর্নীতিবিরোধী ও ‘জেন–জি’ ছাত্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কে পি শর্মা ওলি আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) থেকে নেপালে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় চারবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৭৩ বছর বয়সী এই নেতা তাঁর হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে এবার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। কাঠমান্ডু থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী এই নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী জনপ্রিয় র্যাপার ও সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ (বালেন)।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নেপালে নজিরবিহীন সহিংসতার পর ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওই আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারান এবং বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন ও ওলির বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করেছিল। পদত্যাগের পর তাঁর বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হলেও সম্প্রতি তিনি আবারও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল–ইউএমএল–এর চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনে ওলি নিজের শক্ত ঘাঁটি ঝাপা–৫ আসন থেকে লড়ছেন যেখানে তাঁকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত বালেন শাহ। ওলি এই নির্বাচনকে দেশ গড়ার ও দেশ ধ্বংসের শক্তির মধ্যকার প্রতিযোগিতা হিসেবে অভিহিত করলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন এটি মূলত নেপালের পুরনো রাজনৈতিক ধারা এবং উদীয়মান তারুণ্যের এক অগ্নিপরীক্ষা।
নির্বাচনী প্রচারণায় ওলি দাবি করেছেন যে তিনি ২০২৫ সালের সহিংসতায় পুলিশকে গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ দেননি এবং এর জন্য অনুপ্রবেশকারী ও নৈরাজ্যবাদীদের দায়ী করেছেন। তবে গগন থাপার মতো নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং বালেন শাহর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ওলির পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে। তরুণ ভোটারদের মাঝে বালেন শাহর দুর্নীতিবিরোধী গান ও আধুনিক নেপাল গড়ার অঙ্গীকার ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি এই নির্বাচনকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী হিসেবে বর্ণনা করেছেন যেখানে ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন এবং তাঁদের ৩০ শতাংশেরই বয়স ৪০ বছরের নিচে।
ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের এই নির্বাচন ভূ–রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে ওলি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করলেও তাঁর কট্টর জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। ৫ মার্চের এই ভোটই নির্ধারণ করবে নেপাল কি তাঁর পুরনো অভিজ্ঞ নেতার হাতেই ফিরে যাবে নাকি তারুণ্যের নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের পথে যাত্রা শুরু করবে।
একদিকে দীর্ঘ কারাবাস আর অভিজ্ঞতার ঝুলি অন্যদিকে নতুন স্বপ্ন আর আধুনিক চিন্তার সংঘাত; নেপালের রাজপথ আজ সেই দ্বৈরথের সাক্ষী। ক্ষমতার পালাবদলে যারই জয় হোক সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কেবল একটি দুর্নীতিমুক্ত ও স্থিতিশীল নেপাল যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর পাবে যথাযথ সম্মান।