হরমুজ প্রণালী সচল রাখার ঘোষণা তেহরানের তবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুঁশিয়ারি
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে চলমান উদ্বেগের মাঝে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরান। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। শনিবার (৭ মার্চ) তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানান যে ইরান আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচলের অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই রুট দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে যা বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে।
ইরানি সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্যে যেমন সচল রাখার আশ্বাস মিলেছে তেমনি এর সাথে যুক্ত হয়েছে কড়া শর্ত ও সতর্কবার্তা। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে ইচ্ছুক কোনো সাধারণ জাহাজকে তারা বাধা দেবে না তবে বর্তমান অস্থিরতার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট জাহাজের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়ভার সেই কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে। এটি মূলত একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত যে এই পথে নৌচলাচল এখন আর আগের মতো ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে ইরান একদিকে যেমন নিজেদের দায়িত্বশীলতা জাহির করেছে অন্যদিকে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার পথও প্রশস্ত রেখেছে।
তবে সাধারণ বাণিজ্যের বিষয়ে নমনীয় হলেও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন। মুখপাত্রের দেওয়া হুঁশিয়ারি অনুযায়ী যদি কোনো জায়নবাদী রাষ্ট্র অর্থাৎ ইসরাইল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী কোনো জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রমের দুঃসাহস দেখায় তবে সেটিকে তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে ইরানি বাহিনী। আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই তেহরান এই যুদ্ধংদেহী অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
একটি সংকীর্ণ জলপথ যখন বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করে তখন সেখানে শান্তির বদলে যুদ্ধের দামামা বাজার অর্থ হলো কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর আঘাত হানা। সমুদ্রের নীল জলরাশি যেখানে দেশ ও মহাদেশের মধ্যে সেতুবন্ধন হওয়ার কথা ছিল সেখানে আজ অস্ত্রের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। শক্তির দাপট আর রাজনৈতিক আধিপত্যের এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা যেন তলিয়ে না যায় সেটিই এখন বিশ্ববাসীর কাম্য। শান্তির আলোকবর্তিকা একদিন এই মেঘাচ্ছন্ন আকাশকে আলোকিত করবে এবং প্রতিটি জাহাজ নির্ভয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে এমন প্রত্যাশাই মানবসভ্যতার পরম আকুতি। পারস্পরিক সংঘাতের পরিবর্তে যদি আমরা সহাবস্থানের পথ বেছে নিই তবেই কেবল এই নীল জলরাশি অনাগত প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও শান্তিময় হয়ে উঠবে।