অপ্রতিরোধ্য ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত যুদ্ধসংকট: ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো মার্কিন ব্যয়
আমেরিকা ও ইসরায়েলের উপর্যুপরি হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একের পর এক প্রয়াণ ঘটলেও তেহরানকে দমানো সম্ভব হয়নি। বরং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত অব্যাহত রেখেছে দেশটি। এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ফলে ওয়াশিংটন যেমন জয়ের দাবি করতে পারছে না, তেমনি গুণতে হচ্ছে বিশাল অর্থনৈতিক খেসারত। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের দেওয়া তথ্যমতে, এই যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় ইতোমধ্যে ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রণক্ষেত্রে এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে জয়ের কোনো স্পষ্ট রেখা না থাকায় খোদ খোদ মার্কিন রাজনৈতিক মহলেই এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে।
যুদ্ধের ময়দানে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের জোরালো হামলায় নতুন করে ১৯২ জন ইসরায়েলি নাগরিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৭২৭ জন ইসরায়েলি নাগরিক আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইরান এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার অর্ধেকেরও বেশি আঘাত হেনেছে আবুধাবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। গত বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকেও দুবাইসহ জিসিসিভুক্ত একাধিক শহরে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিকভাবে ইরানকে পঙ্গু করার যে পরিকল্পনা ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছিলেন, তা বাস্তবে চরম ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই হত্যাকাণ্ড তেহরানের মজবুত রাজনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করতে পারবে না। তিনি উল্লেখ করেন যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার মতো অপূরণীয় ক্ষতির পরও ইরান নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। গত সোমবার রাতের হামলায় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং পরবর্তীতে আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি নিহত হলেও দ্রুততম সময়ে তাদের বিকল্প নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরাঘচির মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় বরং এটি একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘গ্যাংস্টার’ স্টাইলের সন্ত্রাসবাদ হিসেবে অভিহিত করেছেন যা যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে মানবিক ও আর্থিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য ইরান সরাসরি আমেরিকাকে দায়ী করছে এবং এর একক দায়ভার ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে ইরানকে ভেনেজুয়েলার মতো অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কেবল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই আনছে না, বরং বিশ্বব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি করছে, তার ভার বহন করা ট্রাম্পের জন্য আগামীতে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বারুদের ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে যখন নেতৃত্বের দম্ভ আর প্রতিশোধের নেশা প্রবল হয়, তখন সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরে সাধারণ মানুষের। প্রিয়জন হারানো প্রতিটি পরিবারের হাহাকার যেন কোনো সীমানা মানে না, বরং তা বিশ্ববিবেকের কাছে এক করুণ আর্তনাদ হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে অস্ত্রের আস্ফালন থেমে গিয়ে আলোচনার টেবিলে মিলবে প্রতিটি সংকটের স্থায়ী সমাধান। অন্ধকারের সকল যুদ্ধংদেহী উন্মাদনা মুছে গিয়ে মানবিকতার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি সীমান্ত এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাক তার নির্ভয় যাপন ও চিরস্থায়ী নিরাপত্তা। সাহসের সাথে শান্তির পথ অন্বেষণ করেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে এক যুদ্ধমুক্ত ও স্থিতিশীল বিশ্ব।