ভারতে ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দের আর্তনাদ স্তব্ধ: সেন্সর বোর্ডে আটকে গেল অস্কার মনোনীত চলচ্চিত্র
বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ও অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পাওয়া তিউনিশীয় সিনেমা ‘দ্য ভয়েজ অব হিন্দ রজব’ ভারতে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবের মর্মান্তিক মৃত্যুর সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটিকে রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার অজুহাতে আটকে দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও ভ্যারাইটির প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে। চলচ্চিত্রটির ভারতীয় পরিবেশক সংস্থা ‘জয় বিরাত্রা এন্টারটেইনমেন্ট’ দাবি করেছে যে ভারত ও ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ফাটল ধরার আশঙ্কায় সেন্সর বোর্ড সিনেমাটিকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পরিবেশক সংস্থার প্রধান মনোজ নন্দওয়ানা জানান যে গত ফেব্রুয়ারিতে সেন্সর ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হলেও বোর্ড সদস্যরা সিনেমাটি মুক্তি দিলে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোতে সিনেমাটি মুক্তি পেলেও সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি। প্রখ্যাত নির্মাতা কাউথার বেন হানিয়া পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি গত সেপ্টেম্বরে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সিলভার লায়ন’ পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি দর্শকদের দীর্ঘ ২০ মিনিটের দাঁড়িয়ে অভিবাদন কুড়িয়েছিল। ২০২৪ সালে গাজা ছাড়ার সময় ইসরায়েলি হামলায় পরিবারের সদস্যদের সাথে গাড়িতে আটকে পড়া শিশু হিন্দের বাঁচার আকুতি সংবলিত প্রকৃত ফোন কল এই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে যা বিশ্ববিবেকে নাড়া দিয়েছিল।
সিনেমাটি প্রদর্শনে বাধার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কংগ্রেস নেতা ও সংসদ সদস্য শশী থারুর এই পদক্ষেপকে ‘লজ্জাজনক’ অভিহিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হলো একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিফলন এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হতে পারে এই ভয়ে সৃজনশীল কাজ নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি একটি পরিপক্ব গণতন্ত্রের জন্য অশোভন। বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অধীনে ইসরায়েলের প্রতি ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সমর্থনের কারণেই সেন্সর বোর্ড এমন কঠোর অবস্থানে রয়েছে যা ভারতের চিরাচরিত মুক্তচিন্তার পরিপন্থী।
একটি শিশুর আর্তনাদ যখন রাজনীতির দাবার চালে পিষ্ট হয় তখন তা কেবল একটি চলচ্চিত্রের পরাজয় নয় বরং মানবতার কণ্ঠরোধের শামিল। রূপালি পর্দার কাহিনী যখন বাস্তব জীবনের নিষ্ঠুরতাকে ফুটিয়ে তোলে তখন তাকে ভয় পাওয়া মানেই হলো সত্যের মুখোমুখি হতে কুন্ঠাবোধ করা। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে শিল্প ও সৃজনশীলতা কোনো ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সীমানায় বন্দি থাকবে না এবং প্রতিটি সত্য কাহিনী তার আপন মহিমায় বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশিত হবে। অন্ধকারের সকল সেন্সরশিপ আর সংকীর্ণতা মুছে গিয়ে শিল্পের আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি জনপদ এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাক তার দেখার ও জানার মৌলিক অধিকার। সাহসের সাথে সত্যকে গ্রহণ করেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে এক মুক্ত ও বৈষম্যহীন পৃথিবী।