বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নে অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনীতি ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল মূল্যের প্রভাবে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকির পূর্বাভাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বুধবার ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে যেখানে বলা হয় যে ২০২৬ সালের প্রথম দুই প্রান্তিকে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রথম প্রান্তিকে সত্তর শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি পায় তবে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে যা সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে তেলের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি যদি বিনিময় হার পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত অবমূল্যায়িত হয় তবে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বর্তমানের চেয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে সরকার যদি জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে নিজস্ব রাজস্ব থেকে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীল রাখে তবে মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভের ক্ষেত্রেও সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির চাপ এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অব্যাহত হস্তক্ষেপের কারণে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রিজার্ভ প্রায় ছয় দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি মুদ্রার অবমূল্যায়ন দশ শতাংশে পৌঁছায় তবে এই রিজার্ভ ক্ষয়ের মাত্রা আরও তীব্রতর হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নীতিগত প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বিনিময় হারে কিছুটা নমনীয়তা আনা এবং রাজস্ব ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে জ্বালানি মূল্যে আংশিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই সংকটের মাঝেও কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে কূটনৈতিক তৎপরতা কারণ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। বুধবার ভোরে কার্যকর হওয়া এই চুক্তির ফলে সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে। দিনশেষে অর্থনৈতিক এই জটিল সমীকরণ ও পরিসংখ্যানের আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান যেন অটুট থাকে সেটাই হোক আগামীর প্রধান লক্ষ্য কারণ একটি শক্তিশালী অর্থনীতিই পারে জনজীবনের অনিশ্চয়তা দূর করে সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা দিতে।