প্রকৃতির কোলে নান্দনিক ইফতার: প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়তে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিনব উদ্যোগ
সবুজ শ্যামল ক্যাম্পাসে প্লাস্টিক বর্জ্যের অভিশাপমুক্ত এক পরিচ্ছন্ন পৃথিবীর বার্তা ছড়িয়ে দিতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন হলো ব্যতিক্রমী এক ইফতার আয়োজন। পরিবেশ সুরক্ষা ও পলিথিনমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিবেশ ক্লাবের সদস্যরা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ইফতার পরিবেশন করে সচেতনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) পবিত্র মাহে রমজানের মহিমান্বিত ক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে কয়েকশত শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিগণ অংশগ্রহণ করেন।
আধুনিক যুগের কৃত্রিমতা পরিহার করে শিক্ষার্থীরা এবারের ইফতারে থালা-বাসনের বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী কলাপাতা। সাধারণ আয়োজনগুলোতে যেখানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক প্লেট ও গ্লাসের স্তূপ জমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে, সেখানে এই আয়োজনে কাঁচের জগ ও গ্লাস ব্যবহার করে শতভাগ বর্জ্যমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে যে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি জিরো ওয়েস্ট বা শূন্য বর্জ্য নীতির ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছিল। ব্যবহারের পর কলাপাতা ও উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো ফেলে না দিয়ে সরাসরি গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের চমৎকার এক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ এই মহতী উদ্যোগে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে আরও অংশ নেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী এবং কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মামুন। পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের এই সৃজনশীল প্রচেষ্টায় ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন ক্লাবের উপদেষ্টামণ্ডলী, যাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেমিস্ট্রি ও বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মেহেদী হাসান খান, কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শারাফ উদ্দিন, পশু ও মৎস্য জীবপ্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং উদ্ভিদ ও পরিবেশ জীবপ্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আরশাদ আলী।
অনুষ্ঠানে সংহতি প্রকাশ করে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আফজারুল ইসলাম, সিলেট অনলাইন প্রেস ক্লাবের সভাপতি গোলজার আহমদ হেলাল এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে ধরিত্রীকে বাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নয় বরং ব্যক্তিগত পর্যায়ের ছোট ছোট সচেতনতাই পারে বড় পরিবর্তন আনতে। প্লাস্টিকের ভয়াবহতা রোধে তরুণ প্রজন্মের এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য এক ইতিবাচক সংকেত।
আসলে প্রকৃতি আমাদের অকৃপণভাবে সব দিলেও বিনিময়ে আমরা তাকে দিচ্ছি কেবল দূষণ আর অবহেলা। কৃত্রিমতার এই ভিড়ে মাটির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটি যেন আমাদের হৃদয়ে এক গভীর উপলব্ধির জন্ম দেয়। প্রিয় ক্যাম্পাসের ঘাসে বসে কলাপাতায় ইফতারের এই দৃশ্যটি শুধু একটি আয়োজন নয়, বরং এটি ছিল শেকড়কে খোঁজার এক পরম তৃপ্তি। যখন তরুণরা এভাবে প্রকৃতির সাথে মিতালি করতে শেখে, তখন বিশ্বাস জাগে যে আমাদের আগামীর পৃথিবী হবে আরও স্নিগ্ধ, আরও সবুজ এবং নিরাপদ। যা দেখে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে থাকা দেশপ্রেমিক মানুষেরা পরম মমতায় বলতে পারবেন যে আমার দেশের মাটি ও মানুষ সত্যিই অনন্য।